'অনুভূতি‌হীন মানুষের জীবন মানে ফলহীন বৃক্ষ'


প্রত্যেক সচেতন মানুষ মাত্রই জানেন যে, আল্লাহ পাকের অন্যান্য আট-দশটা সৃষ্টির মত মানুষের কাজ কেবল খাওয়া-ঘুমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার রয়েছে প্রভুর পক্ষ থেকে অর্পিত অঢেল দায়িত্ব। তার জীবনের প্রতিটি বাঁকের রয়েছে সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য।


এ বিষয়ে আল্লাহ পাক বলেন,

‘আমি জিন ও মানবজাতিকে শুধুমাত্র আমার ইবাদত ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করিনি। অর্থাৎ ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা যারিয়াত : আয়াত ৫৬)


ইবাদতের অর্থ: আরবি ‘ইবাদত’ শব্দটি ‘আব্‌দ’ শব্দ হতে এসেছে। আর ‘আব্‌দ’ অর্থ হলো দাস বা গোলাম। সুতরাং ‘লিয়া’বুদুন তথা ইবাদত’ মানে হলো- আল্লাহর গোলামি বা বন্দেগি করা। 


এখন প্রশ্ন হল গোলামী বা বন্দেগীটা কী রকম?


তা নিয়ে আল্লাহ পাক অন্য জায়গায় বলেন,

রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তোমাদেরকে যা দেন (নিয়ে এসেছেন), তা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাক এবং আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়‌ই আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা।’ (সুরা হাশর : আয়াত ৭)


অর্থাৎ আমরা এখান থেকে চলার পথে রোডম্যাপ যায়। জেনে যায় বন্দেগীর প্রকৃত ধরন। কি সেই রোডম্যাপ? সহজ কথায় তা হলো আল্লাহর রাসূল সা. যা করতে নিষেধ করেছেন তার থেকে বিরত থাকা। এবং যা করতে আদেশ করেছেন বা উৎসাহ দিয়েছেন তা পালন করা। তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি শুধু নামায, রোজা, হজ্জ, যাকাতের ক্ষেত্রে আদেশ নিষেধ করেছেন নাকি জীবনের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে তিনি সুস্পষ্ট গাইডলাইন দিয়ে গেছেন। এক্ষেত্রে দ্বিতীয়টির দাবি‌ই সত্য। তাই, আমরা যদি চলার পথে প্রত্যেকটি পদক্ষেপ তার নির্দেশনা অনুযায়ী চালিত করি তাহলে পুরো জীবনটিই ইবাদতে পূর্ণ হয়ে যাবে।


কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, অধিকাংশ মানুষ‌ই জানেনা তার জীবনের উদ্দেশ্য কি। জানেনা কোন কর্ম গুণের বিনিময়ে শ্রেষ্ঠত্বের সিড়িতে আসীন হতে পারবে। অনেকটা লাগামহীন ঘোড়ার মত জীবনের চলার গতি ! ফলে, মন যা চায় তাই করে !


আমরা যদি সম্প্রতি দেশের পত্রিকার পাতা গুলোর দিকে চোখ বুলায় তাহলে নিশ্চয়ই দেখতে পাবো ধর্ষণ-হত্যার কি হিড়িক চলতেছে ! আজকে একজন হলে কালকে পাঁচজন পরেরদিন বারজন অনেকটা জ্যামিতিক হারে ! সচেতন পাঠক মাত্রই আমার সাথে একমত হবেন কেবল জেল জরিমানা দিয়ে এ বিষয়টির নিষ্পত্তি সম্ভব না। নিশ্চয়ই বিচারিক পন্থা হিসেবে এর উপযোগিতা রয়েছে। কিন্তু, এটা ছাড়া‌ও এই অভিশাপের স্থায়ী মূলোৎপাটনের জন্য মানুষ তথা পুরো জাতির মনস্তাত্ত্বিক তথা মূল্যবোধের পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। 


তবে, এই মূল্যবোধ তথা নৈতিকতার মূল উপকরণ গুলো কি কি ?

তার আগে আমাদের জানতে হবে মূল্যবোধ জিনিসটা কি।


সমাজবিজ্ঞানী David Popenoe তাঁর “Sociology’ গ্রন্থে বলেন যে, মূল্যবোধ হলো “Idea Shared by members of a Society about what is good and lod right & wrong, desirable and Undesirable”. অর্থাৎ ভাল-মন্দ, ঠিক-বেঠিক কাঙ্ক্ষিত-অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় সম্পর্কে সমাজের সদস্যদের যে ধারণা তার নামই মূল্যবোধ।

আর সেই সমীকরণের আলোকে বলতে পারি, সে ধারণা বা বিশ্বাসটি যখন ইসলামের আল বিষয়বস্তুর আদলে প্রতিষ্ঠিত হয় তাহলে তা হবে ইসলামী মূল্যবোধ। আর ইসলামের সংক্ষিপ্ত পরিচয় হলো : যা আল্লাহ পাক জানিয়েছেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যক্তিজীবনে যা করিয়ে দেখিয়েছেন। আর মুসলিম হিসেবে আমরা হব ইসলামী মূল্যবোধের ধারক বাহক এটাই বাস্তবতা।


ইতোমধ্যেই আমরা জেনেছি যে, মূল্যবোধ হলো একটি বিশ্বাসের নাম আর সেই বিশ্বাসের সূত্রপাত ঘটে মানুষের অন্তর থেকে। জেনে রাখা ভালো, যে জিনিস প্রত্যক্ষ করতেছি তার জন্য বিশ্বাসের উপযোগিতা নেই।


ইসলামী মূল্যবোধের আলোকে নৈতিকতা গঠনের এবং তার যে অন্তর্নিহিত ব্যাখ্যা শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ইসলামী স্কলার আবুল আ'লা ম‌ওদুদী রহ.বলেছেন তা হুবহু তুলে ধরা হল-

নৈতিকততার গুরুত্ব নিয়ে তিনি বলেন,


"সমষ্টিগতভাবে তার সাফল্য ও ব্যর্থতা এবং তার উত্থান ও পতন বৈষয়িক বা বস্তুনিষ্ঠ ও নৈতিক এই উভয়বিধ শক্তির উপর একান্তভাবে নির্ভর করে। মানুষ না বস্তুনিষ্ঠ শক্তি নিরপেক্ষ হতে পারে, আর না নৈতিক শক্তির মুখাপেক্ষীহীন হয়ে কিছু সময় বাঁচতে পারে। তার উন্নতি লাভ হলে উভয় শক্তির ভিত্তিতেই হবে, আর পতন হলেও ঠিক তখনি হবে, যখন এই উভয়বিধ শক্তি হতেই সে বঞ্চিত হয়ে যাবে। অথবা এটা অন্যান্যের তুলনায় অপেক্ষাকৃত দুর্বল ও নিস্তেজ হয়ে পড়বে। কিন্তু একটু গভীর ও সূক্ষ্ন দৃষ্টিতে চিন্তা করলে নিঃসন্দেহে বুঝতে পারা যাবে যে, মানব জীবনের মূল সিদ্ধান্তকারী গুরুত্ব রয়েছে নৈতিক শক্তির বৈষয়িক বা বস্তুনিষ্ঠ শক্তির নয়। বৈষয়িক বস্তুনিষ্ঠ উপায়-উপাদান লাভ, স্বাভাবিক পন্থাসমূহের ব্যবহার এবং বাহ্যিক কার্যকারণ পরম্পরাসমূহের আনুকূল্য সাফল্যলাভের জন্য অপরিহার্য শর্ত এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। কাজেই মানুষ যতোদিন এই কার্যকারণ পরম্পরা জগতে বসবাস করবে, এই শর্ত কোনোরূপেই উপেক্ষিত হতে পারে না। কিন্তু এতদসত্ত্বেও যে মূল জিনিসটি মানুষের পতন ঘটায়, উত্থান দান করে এবং তার ভাগ্য নির্ধারণের ব্যাপারে যে জিনিসটির সর্বাপেক্ষা অধিক প্রভাব রয়েছে, তা একমাত্র নৈতিক শক্তি ভিন্ন আর কিছুই নয়। এটা সুস্পষ্ট যে, মানুষকে এর দেহসত্তা বা এর পাশবিক দিকটার জন্য কখনও মানুষ বলে অভিহিত করা হয় না, বরং মানুষকে মানুষ বলা হয় এর নৈতিক গুণ-গরিমার কারণে।" 

(ইসলামী আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি, সাইয়্যেদ আবুল আ'লা ম‌ওদুদী রহ. পৃ-১০)


তিনি আর‌ও যুক্ত করেন,

"মানুষের একটি দেহ আছে, স্বতন্ত্র একটি সত্তা আছে, তা কতোখানি স্থান দখল করে থাকে, সে শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করে, কিংবা বংশ বৃদ্ধি করে; কিন্তু শুধু এই কারণে মানুষ দুনিয়ার অন্যান্য বস্তু ও জন্তু হতে স্বতন্ত্র মর্যাদালাভের অধিকারী হতে পারে না। মানুষ নৈতিক গুণসম্পন্ন জীব, তার নৈতিক স্বাধীনতা ও নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে। ঠিক এই জন্যই মানুষকে দুনিয়ার সমগ্র জীব-জন্তু ও বস্তুর উপর বিশিষ্ট মর্যাদা দান করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, মানুষকে ‘দুনিয়ার বুকে আল্লাহর খলিফা’ হওয়ার মহান মর্যাদায়ও অভিষিক্ত করা হয়েছে। অতএব মানবতার মূল প্রাণবস্তু সর্বাপেক্ষা প্রধান গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যখন মানুষের নৈতিকতা, তখন মানুষের জীবনে গঠন-ভাঙ্গন ও উন্নতি-অবনতির ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তকারী গুরুত্বও যে সেই নৈতিক চরিত্রেই রয়েছে তা কিছুতেই অস্বীকার করা যায় না। বস্তুত মানুষের উত্থান-পতনের উপর তার নৈতিক নিয়ম-বিধানের প্রত্যক্ষ প্রভাব বিদ্যমান।"

(ইসলামী আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি, সাইয়্যেদ আবুল আ'লা ম‌ওদুদী রহ. পৃ-১১)


নৈতিকতার প্রকার/ধরন-

নৈতিকতার ধরন নিয়ে তিনি যুক্ত করেন,

"এই নিগূঢ় তত্ত্ব অনুধাবন করার পর আমরা যখন নৈতিক চরিত্রের গভীরতর বিশ্লেষণ করি, তখন নীতিগতভাবে এর দু’টি প্রধান দিক আমাদের সামনে উদ্‌ভাসিত হয় একটি হচ্ছে মৌলিক মানবীয় চরিত্র, অপরটি হচ্ছে ইসলামী নৈতিক চরিত্র।"

(ইসলামী আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি, সাইয়্যেদ আবুল আ'লা ম‌ওদুদী রহ. পৃ-১১)


নৈতিকতার প্রথম পর্যায়-

"মৌলিক মানবীয় চরিত্র বলতে বুঝায় সেসব গুণবৈশিষ্ট্য যার উপর মানুষের নৈতিক সত্তার ভিত্তি স্থাপিত হয়। ইচ্ছাশক্তি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ শক্তি, প্রবল বাসনা, উচ্চাশা ও নির্ভীক সাহস, সহিষ্ণুতা ও দৃঢ়তা তিতিক্ষা ও কৃচ্ছ্রসাধনা, বীরত্ব ও বীর্যবত্তা, সহনশীলতা ও পরিশ্রম প্রিয়তা উদ্দেশ্যের আকর্ষণ এবং সে জন্য সবকিছুরই উৎসর্গ করার প্রবণতা, সতর্কতা, দূরদৃষ্টি ও অন্তরদৃষ্টি বোধশক্তি ও বিচার ক্ষমতা, পরিস্থিতি যাচাই করা এবং তদুনুযায়ী নিজেকে ঢেলে গঠন করা ও অনুকূল কর্মনীতি গ্রহণ করার যোগ্যতা নিজের হৃদয়াবেগ, ইচ্ছা বাসনা, স্বপ্ন সাধ ও উত্তেজনার সংযমশক্তি এবং অন্যান্য মানুষকে আকৃষ্ট করা, তাদের হৃদয়মনে প্রভাব বিস্তার করা ও তাদেরকে কাজে নিযুক্ত করার দুর্বার বিচক্ষণতা


এছাড়াও আর‌ও কিছু মানবীয় চরিত্র-

আত্মসম্মান জ্ঞান, বদান্যতা, দয়া-অনুগ্রহ, সহানুভূতি, সুবিচার, নিরপেক্ষতা, ঔদার্য ও হৃদয়মনের প্রসারতা, বিশালতা, দৃষ্টির উদারতা, সত্যবাদিতা ও সত্যপ্রিয়তা, বিশ্বাসপরায়ণতা, ন্যায়-নিষ্ঠা, ওয়াদাপূর্ণ করা, বুদ্ধিমত্তা, সভ্যতা, ভব্যতা, পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা এবং মন ও আত্মার সংযম শক্তি'


বস্তুত এগুলোই হচ্ছে মৌলিক মানবীয় চরিত্র। এগুলোকে আমি 'মৌলিক মানবীয় চরিত্র' বলে এজন্য অভিহিত করেছি যে, মূলত এ নৈতিক গুণগুলোই হচ্ছে মানুষের নৈতিক শক্তি ও প্রতিভার মূল উৎস।"

(ইসলামী আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি, সাইয়্যেদ আবুল আ'লা ম‌ওদুদী রহ. পৃ-১৩-১৪)


নৈতিকতার দ্বিতীয় পর্যায়-

নৈতিকতার দ্বিতীয় পর্যায় নিয়ে তিনি বলেন,

"নৈতিক চরিত্রের দ্বিতীয় প্রকার যাকে আমি “ইসলামী নৈতিকতা” বলে অভিহিত করেছি এ সম্পর্কেও আলোচনা করতে হবে। মূলত এটা মৌলিক মানবীয় চরিত্র হতে স্বতন্ত্র ও ভিন্নতর কোনো জিনিস নয়, বরং তার বিশুদ্ধকারী ও পরিপূরক মাত্র।


ইসলাম সর্বপ্রথম মানুষের মৌলিক মানবীয় চরিত্রকে সঠিক ও নির্ভুল কেন্দ্রের সাথে যুক্ত করে দেয়। অতপর এটা সম্পূর্ণরূপে কল্যাণকর ও মঙ্গলময়ে পরিণত হয়। মৌলিক মানবীয় চরিত্র একেবারে প্রাথমিক অবস্থায় বস্তুনিরপেক্ষ নিছক একটি শক্তি মাত্র। এই অবস্থায় তা ভালও হতে পারে, মন্দও হতে পারে, কল্যাণকরও হতে পারে, অকল্যাণের হাতিয়ারও হতে পারে। যেমন, একখানী তরবারি একটি তীর শাণিত অস্ত্র মাত্র। এটা একটি দস্যুর মুষ্টিবদ্ধ হলে যুলুম পীড়নের একটি মারাত্মক হাতিয়ারে পরিণত হবে। আর আল্লাহর পথে জিহাদকারীর হাতে পড়ে এটা হতে পারে সকল কল্যাণ ও মঙ্গলের নিয়ামক। অনুরূপভাবে “মৌলিক মানবীয় চরিত্র” কারো মধ্যে শুধু বর্তমান থাকাই তার কল্যাণকর হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। বরং নৈতিক শক্তি সঠিক পথে নিয়োজিত হওয়ার উপরই তা একান্তভাবে নির্ভর করে। ইসলাম একে সঠিক পথে নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত করে মাত্র। 


'দ্বিতীয়ত, ইসলাম মৌলিক মানবীয় চরিত্রকে সুদৃঢ় করে দেয় এবং চরম প্রান্তসীমা পর্যন্ত এর ক্ষেত্র ও পরিধি সম্প্রসারিত করে। উদাহরণ স্বরূপ ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার উল্লেখ করা যেতে পারে। সর্বাপেক্ষা অধিক ধৈর্যশীল ও সহিষ্ণু ব্যক্তির মধ্যেও যে ধৈর্য ক্ষমতা দেখতে পাওয়া যায়, তা যদি নিছক বৈষয়িক স্বার্থের জন্য হয় এবং শিরক ও বস্তুবাদী চিন্তার মূল হতে ‘রস’ গ্রহণ করে, তবে তার একটি সীমা আছে, যে পর্যন্ত পৌছিয়ে তা নিঃশেষ হয়ে যায়। অতপর উহা কেঁপে উঠে, নিস্তেজ ও নিষ্প্রভ হয়ে পড়ে। কিন্তু যে ধৈর্য ও তিতিক্ষা তাওহীদের উৎসমূল হতে ‘রস’ গ্রহণ করে এবং যা পার্থিব স্বার্থলাভের জন্য নয় একান্তভাবে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের উদ্দেশ্যেই নিয়োজিত তা ধৈর্য, সহিষ্ণুতা ও তিতিক্ষার এক অতল স্পর্শ মহাসাগরে পরিণত হবে। দুনিয়ার সমগ্র দুঃখ-কষ্ট ও বিপদ-মুসিবত মিলিত হয়েও তাকে শূন্য ও শুষ্ক করতে সমর্থ হয় না।'


'বস্তুত ইসলাম মানুষের সমগ্র জীবনকে একটি অচল-অটল ধৈর্যপূর্ণ পর্বত প্রায় সহিষ্ণু জীবনে পরিণত করে। জীবনের প্রত্যেকটি পদক্ষেপের সঠিক পন্থা অবলম্বন করাই হয় এহেন ইসলামী জীবনের মূলনীতি তাতে সীমাহীন দুঃখ-দুর্দশা, বিপদ-মুসিবত, ক্ষতি-লোকসান বরদাশত করতে হলেও এই জীবনে এর কোনো ‘সুফল’ পাওয়া না গেলেও জীবনের গতি ধারায় একবিন্দু পরিমাণ বক্রতা সৃষ্টি করা সম্ভব হবে না।'


তৃতীয়ত, ইসলাম মৌলিক মানবীয় চরিত্রের প্রাথমিক পর্যায়ের উপর মহান উন্নত নৈতিকতার একটি অতি জাঁকজমকপূর্ণ পর্যায় রচনা করে দেয়। এর ফলে মানুষ সৌজন্য ও মাহাত্ম্যের এক চূড়ান্ত ও উচ্চ পর্যায়ে আরোহন করে থাকে। ইসলাম মানুষের হৃদয়মনকে স্বার্থপরতা, আত্মম্ভরিতা, অত্যাচার, নির্লজ্জতা ও অসংলগ্নতা, উশৃঙ্খলতা হতে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করে দেয় এবং তাতে আল্লাহর ভয়, তাকওয়া, আত্মশুদ্ধি, সত্যবাদিতা ও সত্যপ্রিয়তা জাগিয়ে তোলে। তার মধ্যে নৈতিক দায়িত্ববোধ অত্যন্ত তীব্র ও সচেতন করে তোলে। আত্মসংযমে তাকে সর্বতোভাবে অভ্যস্ত নিখিল সৃষ্টি জগতের প্রতি তাকে দয়াবান, সৌজন্যশীল, অনুগ্রহ সম্পন্ন, সহানুভূতিপূর্ণ, বিশ্বাসভাজন, স্বার্থহীন, সদিচ্ছাপূর্ণ, নিষ্কলুষ নির্মল ও নিরপেক্ষ, সুবিচারক এবং সর্বক্ষণের জন্য সত্যবাদী ও সত্যপ্রিয় করে দেয়। তার মধ্যে এমন এক উচ্চ পবিত্র প্রকৃতি লালিত-পালিত হতে থাকে, যার নিকট সবসময় মঙ্গলেরই আশা করা যেতে পারে অন্যায় এবং পাপের কোনো আশংকা তার দিক হতে থাকতে পারে না। উপরন্তু, ইসলাম মানুষকে কেবল ব্যক্তিগতভাবে সৎ বানিয়েই ক্ষ্যান্ত হয় না। তা যথেষ্টও মনে করে না। রসূলের বাণী অনুযায়ী তাকেঃ مفتاح للخير ومفلاق لشر কল্যাণের দ্বার উৎঘাটন এবং অকল্যাণের পথ রোধকারীও বানিয়ে দেয়। অন্য কথায় গঠনমূলক দৃষ্টিতে ইসলাম তার উপর ন্যায়ের প্রচার ও প্রতিষ্ঠা এবং অন্যায়ের প্রতিরোধ ও মূলোৎপাটনের বিরাট কর্তব্য পালনের দায়িত্ব অর্পন করে। এরূপ স্বভাব-প্রকৃতি লাভ করতে পারলে এবং কার্যত ইসলামের বিরাট মহান মিশনের জন্য সাধনা করলে এর সর্বাত্মক বিজয়াভিযানের মোকাবিলা করা কোনো পার্থিব শক্তিরই সাধ্যায়ত্ত হবে না।"


(ইসলামী আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি, সাইয়্যেদ আবুল আ'লা ম‌ওদুদী রহ.পৃ : ১৬-১৮)


পরিশেষে একটি আবেদন‌ই রাখতে চাই, তাহল আমরা যেন নৈতিকতা বিবর্জিত এবং লক্ষ্যহীন পথিক হিসেবে নিজেদের তৈরি না করি‌। যে মানুষ নৈতিকতার গুরুত্ব ও জীবনের লক্ষ্যকে ফেলনা মনে করে তাকে আমরা অনুভূতিহীন মানব বা রোবট-ই আখ্যা দিতে পারি। কারণ, যে মানুষ উদ্দেশ্যহীনভাবে জীবন যাপন করে তার জীবনে নিজের ও সমাজের জন্য তো কোন আউটপুট নাই-ই। সঙ্গে রয়েছে অবর্ণনীয় ক্ষতির সম্ভাবনা। প্রকৃতপক্ষে, মানুষ বেকার বা উদ্দেশ্যহীন থাকলেও শয়তান তাকে বেকার বসিয়ে রাখে না। বরং তার সহচর বানিয়ে নেই। আর বাকিটুকু বুঝতেই পারতেছেন...!

মন্তব্যসমূহ