ক্রন্দনশীল চক্ষু, আল্লাহর অতিপ্রিয় বস্তু
তাহলে উপায় ? উপায় খুব সুন্দর ও সুস্পষ্ট। তার আগে জানতে হবে ভুল/গুনাহ সম্পর্কে আরও অজানা কিছু কথা।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'সেই মহান সত্তার শপথ! যার হাতে আমার জীবন! তোমরা যদি গোনাহ না করতে তাহলে আল্লাহ তোমাদের ধ্বংস করে দিতেন এবং নতুন এমন এক জাতি সৃষ্টি করতেন, যারা গোনাহ করত আবার পরক্ষণেই আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতো। তার তিনি তাদের ক্ষমা করে দিতেন।’ (মুসলিম)।
কি বুঝলেন ? যে জিনিসটির (ভুল/গুনাহ) জন্য আপনি হতাশার গ্রহে আবদ্ধ হয়েছেন, অথচ সে জিনিসটির শূণ্য উপস্থিতির জন্য আল্লাহ পাক একটি জাতিকে বিলুপ্ত করতে চান। কারণ কি ? কারণ একটাই কোন মানুষ যখন হঠাৎ গুনাহ করে আল্লাহর দরবারে ধরণা দিয়ে অবনত মস্তিষ্কে অশ্রুসিক্ত নয়নে প্রার্থনা করে, তখন আল্লাহ পাকের বড্ড ভালো লাগে। যার প্রতিফলন ঘটেছে নিম্নোক্ত হাদিসে-
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জাহান্নামের আগুন দুটি চোখকে স্পর্শ করবে না। আল্লাহর ভয়ে যে চোখ কান্না করে এবং আল্লাহর রাস্তায় যে চোখ পাহারা দিয়ে ঘুমবিহীনভাবে রাত পার করে দেয়।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস ১৬৩৯)
তিনি অন্য জায়গায় বলেছেন,
বলেন, ‘তোমরা কান্নাকাটি করো, যদি কাঁদতে না পারো তবে কান্নার ভান করো বা কাঁদার চেষ্টা করো।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস ৪১৯৬)
যে কান্নার ধ্বনি আল্লাহর কাছে অতিপ্রিয়
মহানবী (সা.) মুমিনকে কাঁদতে বলেছেন, তবে তা পার্থিব আবেগ-অনুভূতির জন্য নয়; বরং মুমিন কাঁদবে আল্লাহর ভয়ে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সাত শ্রেণির মানুষকে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাঁর আরশের নিচে ছায়া দেবেন, যেদিন তাঁর ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না। তাদের এক শ্রেণি, যারা নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তার চোখ দুটি অশ্রুসিক্ত হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৮০৬)
অন্য হাদিসে এসেছে, ‘দুটি ফোঁটা ও দুটি চিহ্নের চেয়ে বেশি প্রিয় আল্লাহ তাআলার কাছে আর কিছু নেই। আল্লাহর ভয়ে যে অশ্রুর ফোঁটা পড়ে, আল্লাহর পথে যে রক্তের ফোঁটা নির্গত হয় এবং আল্লাহর নির্ধারিত কোনো ফরজ আদায় করতে গিয়ে যে চিহ্ন সৃষ্টি হয়।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস ১৬৬৯)
আল্লাহর প্রিয় জনদের কান্নার খণ্ডিত উপমা
পৃথিবীর সব নবী ও রাসুল নিষ্পাপ ছিলেন। তবু তাঁরা আল্লাহর ভয়ে ভীত ছিলেন, আল্লাহর ভয়ে তাঁরা কান্না করতেন। আল্লাহর ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির প্রভাবে তাঁরা কান্না করতেন। তা ছাড়া উম্মতকে শিক্ষাদানও তাঁদের কান্নার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘এরাই তারা, নবীদের মধ্যে যাদের আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন আদমের বংশ থেকে এবং যাদের আমি নুহের সঙ্গে নৌকায় আরোহণ করিয়েছিলাম; ইবরাহিম ও ইসমাইলের বংশোদ্ভূত এবং যাদের আমি পথনির্দেশ করেছিলাম ও মনোনীত করেছিলাম, তাঁদের কাছে দয়াময়ের আয়াত তিলাওয়াত করা হলে তারা সিজদায় লুটিয়ে পড়ত কাঁদতে কাঁদতে।’ (সুরা : মারইয়াম, আয়াত : ৫৮)
আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি একবার রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এলাম, তখন তিনি নামাজ আদায় করছিলেন আর তাঁর ভেতরে ডেকচির শব্দের মতো শব্দ হচ্ছিল, অর্থাৎ তিনি কাঁদছিলেন।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস ১২১৪)
আয়েশা (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে প্রচণ্ড রকম কাঁদতে দেখে বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আপনি কাঁদছেন! অথচ আল্লাহ আপনার পূর্বের ও পরের সব গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হব না?’ (সহিহ ইবনে হিব্বান : ২/৩৮৬)
যে দোষ থেকে রাসূল সা. পানাহ চেয়েছেন
আর রাসুলুল্লাহ (সা.) হৃদয়ের কঠোরতা থেকে মুক্তি চেয়ে দোয়া করতেন, ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই এমন জ্ঞান থেকে, যা কোনো উপকারে আসে না; এমন হৃদয় থেকে, যা ভীত হয় না; এমন আত্মা থেকে, যা তৃপ্ত হয় না এবং এমন আহ্বান থেকে, যাতে সাড়া দেওয়া হয় না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৭২২)
এবার বলি সেই না বলা 'উপায়ের' কথা-
আশাকরি, আপনি সেই বুদ্ধিমান মানুষ, যিনি অতিসহজে আপন লক্ষ্য বুঝতে বা চিহ্নিত করতে পারেন। কারণ, আমি ইতোমধ্যে ভুল সম্পর্কে অজানা তথ্য জানাতে গিয়ে উদ্ভূত সমস্যার উপায় বা পাথয়ের সন্ধান দিয়ে দিয়েছি। আচ্ছা, তারপরও বলে দিচ্ছি- সেটি হলো বেশি বেশি কাঁদা। আল্লাহর কাছে ধরণা দিয়ে গোপনে বেশি বেশি অশ্রু বিসর্জন দেয়া। যার ফলে, মূলোৎপাটন ঘটবে হতাশার, জ্বলে উঠবে আশার প্রদীপ। গুনাহ গুলো পুণ্যে পরিণত হবে। জীবন হবে সুন্দর ও অমূল্য সম্ভাবনার আঁধার।
ইস্তিগফারের বিশেষ সময়-
(ক) ফরয সালাতের শেষে
রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন সলাত শেষ করতেন তখন তিনবার ইস্তিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। এই হাদীসের একজন বর্ণনাকারী আল ওয়ালীদ তার শিক্ষক আল আওযা‘ঈ (রহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞেস করলেন, কীভাবে ইস্তিগফার করতে হয়? তিনি বললেন, ‘‘আস্তাগফিরুল্লাহ’’ বল (সহীহ মুসলিম : ১৩৬২)
(খ) শেষ রাতে
‘‘যারা ধৈর্যশীল, সত্যবাদী, আনুগত্যশীল ও ব্যয়কারী এবং শেষ রাতে ক্ষমাপ্রার্থনাকারী।’’ (সূরা আ-লি ‘ইমরা-ন ০৩ : ১৭)
‘‘নিশ্চয় মুত্তাকীরা থাকবে জান্নাতসমূহে ও ঝর্ণাধারায়, তাদের রব তাদের যা দিবেন তা তারা খুশীতে গ্রহণকারী হবে। ইতঃপূর্বে (দুনিয়ার জীবনে) এরাই ছিল সৎকর্মশীল। রাতের সামান্য অংশই এরা ঘুমিয়ে কাটাতো। আর রাতের শেষ প্রহরে এরা ক্ষমা চাওয়ায় রত থাকত।’’ (সূরা আয্ যা-রিয়া-ত ৫১ : ১৫-১৮)
রাসূল সা. বলেন,
‘‘রাতের এক-তৃতীয়াংশ বা অর্ধাংশ চলে যাওয়ার পর আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়ার আকাশে নেমে এসে ঘোষণা দিতে থাকেন, আছো কি কোন প্রার্থনাকারী? আমি তাকে দান করবো; আছো কি কোন ক্ষমা প্রার্থনাকারী? আমি তাকে ক্ষমা করে দেবো; আছো কি কোন তাওবাকারী? আমি তার তাওবাহ্ গ্রহণ করবো। আছো কি কোন দু‘আকারী? আমি তার দু‘আর জবাব দেবো।’’ (মুসনাদে আহমাদ : ৯৫৯১, বুখারী-মুসলিমের শর্তানুযায়ী সহীহ)
(গ) সকাল-সন্ধ্যায় সায়্যিদুল ইসতিগফারের মাধ্যমে-
‘‘যে ব্যক্তি দিনে (সকাল) বেলায় দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে এ দু‘আটি (সায়্যিদুল ইসতিগফার) পড়বে অতঃপর সে সেই দিন সন্ধ্যা হওয়ার আগেই মারা যাবে, সে জান্নাতীদের অন্তর্ভুক্ত হবে। আর যে ব্যক্তি রাতে (সন্ধ্যায়) এ দু‘আটি দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে পড়বে অতঃপর সে সেই রাতে ভোর হওয়ার পূর্বেই মারা যাবে, তাহলে সে জান্নাতীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’’ ( সহীহুল বুখারী : ৬৩০৬, ৬৩২৩)
প্রকৃতপক্ষে, আমাদের উচিত দিন-রাত তথা সব সময় আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা জরুরি। কারণ, আমরা প্রায় সব সময়ই জ্ঞাতসারে কিংবা অজ্ঞাতসারে পাপে ডুবে থাকি। কীভাবে যে পাপ হয়ে যাচ্ছে আমরা হয়তো টেরও পাচ্ছি না। তাই আমাদের উচিত সদা সর্বদা ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকা। ক্ষমা প্রার্থনা করার জন্য ব্যাপক কোন প্রস্ত্ততির প্রয়োজন হয় না। অন্তত ‘‘আস্তাগফিরুল্লাহ’’ পড়লেও ক্ষমা প্রার্থনা করা হয়ে যায়। তাই, আমাদের জীবনকে ইস্তিগফারমুখী করি, আর অর্জন করি দয়াময়ের সান্নিধ্য।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন