'পরামর্শ ভিত্তিক জীবন মানে অনন্ত বরকতের নীড়'
সৃষ্টি জগতে মানুষ সবার চেয়ে ব্যতিক্রম এটা অনস্বীকার্য। মানুষের চিন্তাশক্তি যে কত তীক্ষ্ণ তা বিজ্ঞানের অত্যাধুনিক আবিষ্কারের মাধ্যমে ফোঁটে উঠেছে। তারপরও মানুষ ক্ষেত্র বিশেষে অত্যন্ত দুর্বল। সেটা হতে পারে শারীরিক কিংবা মানসিক।
এ বিষয়ে আল্লাহ পাক বলেন,
‘আল্লাহ তিনিই, যিনি তোমাদের সৃষ্টি করেন দুর্বল অবস্থায়। দুর্বলতার পর তিনি দেন শক্তি। শক্তির পর আবার দেন দুর্বলতা ও বার্ধক্য। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। তিনিই সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান।’ (সুরা : রুম, আয়াত : ৫৪)
তাই এই সামগ্রিক দুর্বলতার ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আমাদের ব্যক্তিগত,পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মাশওয়ারা বা পরামর্শের গুরুত্ব অপরিসীম। পরামর্শের মাধ্যমে ঐক্য ও পারস্পরিক ভালোবাসা সুদৃঢ় হয়। সম্মিলিত চিন্তাভাবনা ও বিশ্লেষণের কারণে সহজ ও উত্তম সমাধান বেরিয়ে আসে। সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহজ হয়। ইংরেজিতেও একটা কথা প্রচলিত আছে- 'Always two heads are better than one' । এবং এটাই স্বাভাবিক এবং বৈজ্ঞানিক।
এ বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে আল্লাহ পাক বলেন,
হে নবী, (গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে) আপনি তাদের সঙ্গে পরামর্শ করুন! ( সুরা আলে ইমরান,আয়াত: ১৫৯)
আরও বলেন,
'নিজেদের যাবতীয় সামগ্রিক ব্যাপার নিজেদের পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে সম্পন্ন করে।' (আশ শূরা: ৩৮)
এ বিষয়ে নবিজীর নির্দেশনা-
১) রাসূল (সা) বলেছেন, যখন তোমদের নেতারা হবেন ভাল মানুষ, ধনীরা হবেন দানশীল এবং তোমাদের কার্যক্রম চলবে পরামর্শের ভিত্তিতে তখন মাটির নিচের ভাগ উপরের ভাগ থেকে উত্তম হবে। আর যখন তোমাদের নেতারা হবে খারাপ লোক, ধনীরা হবে কৃপণ এবং নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব যাবে নারীদের হাতে তখন পৃথিবীর উপরের অংশের চেয়ে নিচের অংশ হবে উত্তম (তিরমিযী)।
২) রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, যে ব্যক্তি মুসলমানদের পরামর্শ ছাড়াই আমীর হিসেবে বাইয়াত গ্রহণ করবে, তাদের বাইয়াতও বৈধ হবে না (মুসনাদে আহমাদ)।
৩) যে ব্যক্তি পরামর্শ নিয়ে কাজ করে তাকে কখনও লজ্জিত হতে হয় না। আর যে বা যারা ভেবে চিন্তে ইস্তেখারা করে কাজ করে তাকে ঠকতে হয় না। (মু'জামুস সগীর)
৪) যে পরামর্শ করে কাজ করে সে নিরাপদ থাকে।(আবু দাউদ)
নবী সা.-এর সীরাত পড়লে জানা যায়, তিনি পরামর্শ করে কাজ করাকে কতো গুরুত্ব দিয়েছেন। শুধু জটিল ও কঠিন বিষয়েই নয়, অতি সাধারণ বিষয়েও তিনি সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন। এতে যেমন সবার মন রক্ষা হয়, তেমনি প্রভূত কল্যাণও অর্জিত হয়।
ইসলামি খেলাফত বা রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনার মৌলিক বিষয়াদির অন্যতম বিষয় হল পরামর্শকরণ। হযরত ওমর (রা.) বলেন, পরামর্শ ব্যতিত খেলাফত হতে পারে না। ( কানযুল উম্মাল)তার মানে পরামর্শকে ইসলামে কতো গুরুত্ব দেয়া হয়েছে!
হযরত ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো কাজ করার জন্য পরামর্শ করে, আল্লাহ তায়ালা তাকে সঠিক ও সহজ পথ প্রদর্শন করেন। (বায়হাকী)
আমরা যদি সীরাত গ্রন্থগুলোর দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাব খন্দকের যুদ্ধের সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালমান ফারসীর রা. পরামর্শক্রমে পরিখা খনন করে; যার ফলে শত্রুদের অতিসহজে কাবু করা সম্ভব হয়েছিল। এ রকম অসংখ্য নমুনা রয়েছে।
পরামর্শের গুরুত্ব সম্পর্কে হজরত সুলাইমান (আ.)'র সময়কার আকর্ষণীয় একটি ঘটনা-
একদিন হজরত জিব্রাইল (আ.) হজরত সুলাইমান (আ.)'র কাছে একটি পাত্র দিয়ে বললেন এই পাত্রে এমন এক পানীয় আছে যা পান করলে আপনি কিয়ামত পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারবেন। তবে আপনি এই পানীয় পান করবেন কিনা তা পুরোপুরি আপনার ইচ্ছার ওপরই নির্ভর করছে। এরপর হজরত সুলাইমান (আ.) মানুষ, জ্বীন এবং অন্য জীবজন্তুর পরামর্শ চাইলেন। সবাই নবীকে ওই পানীয় পান করে কিয়ামত পর্যন্ত বেঁচে থাকার পরামর্শ দিলো। এরপর সুলাইমান নবীর মনে হলো একটি প্রাণীর সঙ্গে এখনও পরামর্শ করা হয় নি। আর সেই প্রাণীটি হলো সজারু। এরপরকে সজারুকে ডাকা হলো। সজারুকে ঘটনা খুলে বলার পর পরামর্শ চাওয়া হলো।
সব শুনে সজারু বললো- এই পানীয় কি শুধু আপনার জন্য নাকি আপনার স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি ও বন্ধুরাও তা খেয়ে কিয়ামত পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারবে?
উত্তরে হজরত সুলাইমান বললেন- না শুধু আমাকে এই পানীয় দেওয়া হবে।
এই কথা শুনে সজারু বললো, তাহলে তা ফিরিয়ে দেন। খাওয়ার দরকার নেই।
সুলাইমান (আ.) সজারুকে জিজ্ঞেস করলেন তুমি কেন চিরঞ্জীব হতে নিষেধ করছো?
সজারু বললো- যেহেতু কেবল আপনার জীবনটাই দীর্ঘস্থায়ী হবে, সেকারণে আপনার স্ত্রী, সন্তান, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও সুহৃদ সবাই মারা যাবে। আপনাকে সারা জীবন তাদেরকে হারানোর দুঃখ-বেদনা নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে। তাদেরকে ছাড়া এই জীবনের কী মূল্য আছে?
এসব শুনে হজরত সুলাইমান(আ.) কিয়ামত পর্যন্ত বেঁচে থাকার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন এবং ওই পানীয় আর পান করলেন না।
পরামর্শদাতা ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য
ইসলামে পরামর্শের প্রতি অধিক গুরুত্বারোপ করা হলেও ইসলামী শিক্ষার আলোকে তিন শ্রেণির লোকের সঙ্গে পরামর্শ করার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিৎ। ওই তিন শ্রেণির মানুষ হলো- ভীতু, লোভী ও কৃপণ। ভীতু ও কাপুরুষ লোকদের সঙ্গে পরামর্শ করতে নিষেধ করা হয়েছে এ কারণে যে, তারা অতিরিক্ত ভয়ের কারণে কখনোই কোনো ভালো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে না। কাপুরুষতা মানুষের আত্মবিশ্বাস, ঈমানের দুর্বলতা ও অক্ষমতার প্রমাণ বহন করে। এগুলো মানুষের খারাপ বৈশিষ্ট্য। হযরত আলী (রা.) বলেছেন – ‘বিজ্ঞ আলেম, বিশেষজ্ঞ ও খোদাভীরু দূরদর্শী ব্যক্তিই সর্বোত্তম পরামর্শদাতা।’
পরামর্শ বা মত বিনিময়ের ক্ষেত্রে লক্ষণীয় বিষয়-
♦ বুদ্ধিমত্তার সাথে পরামর্শ করা-ই দূরদর্শিতা।
♦ পরামর্শের সময় সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তোমার মত ব্যক্ত কর।- ইবনে মাজা
♦ কল্যাণ কামনার উদ্দেশ্যে পরামর্শ দেওয়া।কারণ দ্বীন মানে হল সর্বক্ষেত্রে কল্যাণ কামনা করা। মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) বলেছেন, হে আলী! আল্লাহর কাছে ভালোর প্রত্যাশী কেউ বিপথে পরিচালিত হয় না এবং মতবিনিময়ের সময় যারা সৎ পরামর্শ করে তাদের অনুতাপ করতে হয় না।
♦ অকল্যাণকর পরামর্শ প্রদান করা থেকে বিরত থাকা হাদীসে বলা হয়েছে ‘যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইকে এমন কাজের পরামর্শ দিল- যে সম্পর্কে সে জানে যে, এর বিপরীত কাজে কল্যাণ রয়েছে, তাহলে সে নিঃসন্দেহে বিশ্বাস ঘাতকতা করেছে।
♦ সংখ্যগরিষ্ঠ মতকে মান্যতা দেওয়া -রাসুলুল্লাহ (সঃ) তিনটি ধ্বংসকারী বিষয়ের কথা উল্লেখ করেছেন তার মধ্যে অন্যতম হলো নিজের মতকে অগ্রাধিকার দেওয়া। আর এটি সর্বাধিক ভয়াবহ।
পরিশেষে বলতে চাই, আল্লাহ ও তার রাসূলের সা. দেখানো মাধ্যম তথা নিয়ামক 'পরামর্শের' ব্যবহারিক প্রয়োগেই কেবল পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে শান্তি ও সমৃদ্ধি আনয়ন সম্ভব। তাই, এটিকে আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গ্রহণ করার বিকল্প নেই।

রাসূল (সা) বলেছেন, যখন তোমদের নেতারা হবেন ভাল মানুষ, ধনীরা হবেন দানশীল এবং তোমাদের কার্যক্রম চলবে পরামর্শের ভিত্তিতে তখন মাটির নিচের ভাগ উপরের ভাগ থেকে উত্তম হবে। আর যখন তোমাদের নেতারা হবে খারাপ লোক, ধনীরা হবে কৃপণ এবং নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব যাবে নারীদের হাতে তখন পৃথিবীর উপরের অংশের চেয়ে নিচের অংশ হবে উত্তম (তিরমিযী)। হাদিস নং কতো?
উত্তরমুছুন"মাটির নিচের ভাগ উপরের ভাগ থেকে উত্তম হবে"
উত্তরমুছুন"পৃথিবীর উপরের অংশের চেয়ে নিচের অংশ হবে উত্তম"
আমার নিকট দুটোই এক মনে হচ্ছে, নয় কি?