'মু'মিন কখনও আশাহত হয় না'
জীবন মানে একটি রণক্ষেত্র, একটি আন্দোলন, একটি পরীক্ষাগার। আমি এই শব্দমালার মাঝেই জীবনের অর্থ খোঁজে পেয়েছি ; ছোট্ট এই বয়সেই ছোট্ট অভিজ্ঞতার আলোকে যতটুকু হৃদয়ঙ্গম করেছি জীবনে চলার পথের বাঁক গুলোকে সেভাবেই বুঝেছি, যেভাবে শব্দ সমূহের অর্থ ফোঁটে উঠেছে। তাও এই ক্ষুদ্র মানবের সীমাবদ্ধ জ্ঞানের চাদরে আবৃত। যে টুকু আছে সেখান থেকেই কিছু লেখা।
যদি সত্যিকারের পথিক হতে চান তাহলে আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেখানো অমীয় সুধা পান করতে হবেই। চলমান থাকতে হবে জীবন সংগ্রামে। তাইতো কবি মল্লিক ভাই বলেছেন,
"আন্দোলন সে তো
জীবনের অন্য নাম
আন্দোলন সে তো
জীবনের অন্য নাম
জীবন মানেই সংগ্রাম
জীবন মানেই সংগ্রাম"
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দুনিয়া মুমিনের জন্য জেলখানা এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।’ [মুসলিম ২৯৫৬, তিরমিযি ২৩২৪, ইবন মাজাহ ৪১১৩, আহমদ ৮০৯০, ২৭৪৯১, ৯৯১৬]
এ হাদিসটি মৌলিক একটি দিক নির্দেশ করে। আর তা হলো জীবন সকলের জন্য পরীক্ষাগার কিংবা আন্দোলনের নাম নয়। কেবল তাদের জন্যই এটি পরীক্ষাগার যারা মাবুদের তরে নিজের জীবনকে বিক্রি করে দিয়েছে। সঁপে দিয়েছে জীবনের সকল চাওয়া-পাওয়াকে তারই(দয়াময়ের) সিদ্ধান্তের আদলে। সেই রংকে করেছে আপন যা তার মাবুদের সনদে স্বীকৃত।
মু'মিনদের নিয়ে মহান আল্লাহ পাকের বাণী-
এরশাদ হচ্ছে : “আর আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং জানমাল ও ফল-ফলাদির স্বল্পতার মাধ্যমে। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও। যারা, তাদেরকে যখন বিপদ আক্রান্ত করে তখন বলে, নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী। তাদের উপরই রয়েছে তাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও রহমত এবং তারাই হিদায়াতপ্রাপ্ত।” ( সূরা আল-বাকারা : ১৫৫-১৫৭।)
এটা কি মীন করে ? এখানে আল্লাহ পাক নিশ্চয়তা দিয়ে বলতেছেন : তিনি ঈমানদারদের পরীক্ষা করবেন। আর যেহেতু তিনি তার প্রতিশ্রুতি রাখেন তাই পরীক্ষাও সংঘটিত হবে এটাই স্বাভাবিক। যদিও আমরা তা স্বাভাবিকভাবে নিতে পারি না(!)
আল্লাহ পাক অন্য জায়গায় এরশাদ করেন,
'প্রতিটি কষ্টের সঙ্গে অবশ্যই কোনো না কোনো দিক থেকে স্বস্তি রয়েছে। কোনো সন্দেহ নেই, অবশ্যই প্রতিটি কষ্টের সঙ্গে অন্য দিকে স্বস্তি আছেই। ’ (সুরা আল-ইনশিরাহ, আয়াত: ৫-৬)
তাই, মু'মিনদের জীবন এরকম কষ্টের মাধ্যমে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যায়। আমরা জানি যতই পুড়ানো হয়, স্বর্ণ ততই খাঁটি হয়। মু'মিনের জীবনেও যত তিতিক্ষার চাপ আসে, ততই নিকটে আসে মাবুদের সান্নিধ্য, ফোঁটে উঠে চারিত্রিক নিষ্কুলতা। বুদ্ধিমান মানুষ তো সেটিকেই আমন্ত্রণ জানাবে যা গড়ে তুলে ইহকালীন-পরকালীন সমৃদ্ধি। যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাস্তব চিত্র ভিন্ন।
তাইতো আল্লাহ পাক বলেন,
"...অধিকাংশই অজ্ঞ" (সূরা আন-আম :১১১)
নবী সা. এর নিম্নোক্ত হাদিসের মাধ্যমেও বুদ্ধিমান ও নির্বোধ লোকের চিত্র ফোঁটে উঠেছে-
তিনি বলেছেন, বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি যে তার নফসের হিসাব-নিকাশ নেয় এবং পরকালের জন্য কাজ করে। আর নির্বোধ ঐ ব্যক্তি যে নিজের নফসের (কুপ্রবৃত্তি) অনুসরণ করে। আবার আল্লাহ পাকের কাছেও আশা আকাঙ্ক্ষা পূরণের প্রত্যাশা রাখে। (জামে তিরমিজি)।
জীবন স্রোতে যে পথিক সম্মুখপানে এগিয়ে যেতে চায় তাকে অবশ্যই বিভিন্ন চড়াই উতরাই পেরিয়েই যেতে হবে।
এক্ষেত্রে মিজানুর রহমান আজহারীর উক্তিটি প্রণিধানযোগ্য,
"যে পথে কাঁটা নেই, সেটি পথ নয় কার্পেট। আর কার্পেটে হেঁটে মজলিসে যাওয়া যায় মঞ্জিলে নয়"
সত্যিই মু'মিনের জীবনের চিত্র এমনই হয়। যা অপ্রিয় হলেও নির্ঘাত সত্য। কিন্তু, কেন ? সর্বপ্রধান কারণ বলতে পারি, মহান আল্লাহর প্রতি নিরঙ্কুশ আনুগত্য। যদিও সমাজে আনুগত্যের প্রকৃত ব্যবহারিক সংজ্ঞা পাল্টে যাচ্ছে। তারা মনে করে নামাজ রোজা পালনের মত কতিপয় ইবাদত সম্পন্ন করা-ই হল আল্লাহ পাকের আনুগত্য। অথচ তারা এটি স্মরণ রাখে না যে, আল্লাহ পাক তাদের আনুগত্যের মুখাপেক্ষীহীন। তারা আনুগত্য করে নিজেদেরই কল্যাণে। সুতরাং, তারা যদি নামাজের মাধ্যমে মসজিদে আল্লাহর আনুগত্য করে কল্যাণ খোঁজে পায়, তাহলে মসজিদের বাইরের ক্ষেত্রে একই প্রভুর আনুগত্যের মাধ্যমে কল্যাণ খোঁজে পাবে না কেন ?
অথচ আল্লাহ পাক মু'মিনের চিত্র তুলে ধরেছেন পুরো জীবনকে নিয়েই মু'মিনকে আনুগত্যের দাবি পেশ করতে হবে। তিনি বলেন,
"নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ সারা জাহানের রব আল্লাহর জন্য’’ (সূরা আনআম ৬ : ১৬২)
অর্থাৎ মু'মিন পুরো জীবনটাই আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের জন্য উৎসর্গ করে দেয়।
মু'মিনদের প্রতি মহান আল্লাহ পাকের আরও নির্দেশ-
"‘হে মু'মিনগণ ! তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কর না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।’ (সূরা বাকারা : ২০৮)"
এ আয়াতটি একটি লাইন অব কন্ট্রোল নির্দেশ করে। আমরা আরও বুঝতে পারি যে, মু'মিনের জীবনে অপূর্ণতা থাকতে পারে। তবে, তা জিইয়ে রাখার জন্য নয় ; বরং সংশোধনের জন্য। অথচ আমরা তা দিনের পর দিন জিইয়ে রাখতেছি। আমরা ঘোষণার মাধ্যমে আল্লাহকে রব মানি কিছু সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রে। আবার যে মানুষ গুলো জীবনের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে আনুগত্যের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনের মাধ্যমে উপর্যুক্ত আয়াতের প্রায়োগিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে তাদের উপর নেমে আসে অবর্ণনীয়, অকথ্য নির্যাতন ! কারণ, আপনি যেখানেই তাগুতকে অস্বীকার করে আল্লাহর বিধান বাস্তবায়ন করতে যাবেন, সেখানেই শুরু হয় অস্তিত্ব রক্ষা ও মূলোৎপাটনের সংঘাত। কারণ, তার (আল্লাহর বিধানের) আলোকে যদি আমরা নিজেদেরকে পরিচালিত করি তাহলে সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। বহু রব থাকে না, থাকে একক রবের আধিপত্য। ফলে, স্বঘোষিত প্রভু গুলো কিংবা তাগুতি শক্তি সেই নিবেদিত প্রাণ মানুষ গুলোর পথ আটকে দেয়ার জন্য সচেষ্ট হয়।
শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মুজাদ্দিদ আবুল আলা মওদুদীর রহ. কলাম থেকে তাঁদের বাস্তব চিত্রখানি তুলে ধরা হল-
"ইতিহাসে প্রথম শ্রেণীর যত মানুষের জীবন কথা পাওয়া যায়, তাদের শতকরা অন্তত নব্বই জন দরিদ্র ও সহায়-সম্বলহীন পিতা-মাতার ঘরে জন্ম নিয়েছেন, দুঃখ-মুছিবতের কোলে লালিত-পালিত হয়েছেন। এ সকল মহামানবকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় জীবনের মহাসাগরে নিক্ষেপ করা হয়েছে তাঁরা সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গমালায় সাঁতার শিখেছেন, পানির নির্মম চপেটাঘাতে সামনে এগিয়ে যাবার দীক্ষা পেয়েছেন। এভাবে জীবন সংগ্রামে অটল-অবিচল থাকার ফলে একদিন সাফল্যের উপকূলে পৌঁছে বিজয়ের ঝাণ্ডা উড্ডীন করতে সক্ষম হয়েছেন।"
পরিশেষে একটি কথা-ই বলবো মু'মিনের জীবন কখনও কুসুমাস্তীর্ণ থাকে না, থাকে কাঁটায় আবৃত। তাই বলে আমাদের উচিত নয় হাল ছেড়ে দেয়া। কারণ, মু'মিন কখনও পার্থিব অর্জনকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করে না, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই থাকে চূড়ান্ত লক্ষ্য।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন