আরেকজন সালাহ্উদ্দীন আইয়ুবীর প্রতীক্ষায় মুসলিম উম্মাহ্
নীল আকাশ আজ তার আপন স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলেছে। অনার্থ মানুষের রক্তে সবুজ পৃথিবী ধারণ করেছে লোহিত বর্ণ। নদী কিংবা সাগর তার চিরাচরিত গতি হারিয়ে ফেলে মন্থর প্রায়। নিপীড়িতের প্রলাপ দেখে বনের পাখি গুলো নির্লিপ্ত কান্নার গুঞ্জন তুলেছে সর্বত্র। তাদের সেই কান্নায় পৃথিবীবাসীর ঘুম না ভাঙলেও সদাজাগ্রত আল্লাহ পাক উদাসীন নন। যখন তারা যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার সেই তিন বছরের শিশুটির ভাষায় ফরিয়াদ জানায়-
‘আমি আল্লাহকে সব বলে দিবো!’ (ওয়ার্ল্ড বাংলা ডটকম, মার্চ-১১, ২০১৬)
যার প্রতিফলন ঘটে নিম্নোক্ত আয়াতে-
‘আর তোমাদের কী হলো যে, তোমরা আল্লাহর পথে লড়াই করছো না দুর্বল সেই পুরুষ, নারী ও শিশুদের পক্ষে যারা বলে হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের এই জনপদ থেকে নিষ্কৃতি দান করুন। এখানকার অধিবাসীরা যে অত্যাচারী। আর তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য পক্ষাবলম্বনকারী নির্ধারণ করে দাও এবং তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য সাহায্যকারী নির্ধারণ করে দাও। ’ (সূরা আন নিসা : ৭৫)
নবীজির ভাষায়,
রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন; ‘মাজলুমের বদদোয়া থেকে বাঁচো, কেননা মাজলুমের বদদোয়া ও আল্লাহর মাঝে কোনো পর্দা থাকে না।’ (বুখারি) অর্থাৎ তার ফরিয়াদ বিনা বাধায় কবুল হয়।
কে শুনে কার কথা (!) বিশ্বজুড়ে চলছে জালিমদের স্টীমরোলার আর বাকি সবাই 'চাচা আগে আপন প্রাণ বাঁচা' প্রবাদের ব্যবহারিক ফল পেতে মরিয়া। অথচ জালিমের এই অত্যাচারকে যারা সহ্য করবে কিংবা তার থেকে ফায়দা নেয়ার চেষ্টায় নিয়োজিত থাকবে তারা ঐ মজলুমদের বদদোয়া থেকে বাঁচতে পারবে কি?
শাসক গোষ্ঠী গুলো ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করতে সকল অপকর্মের আশ্রয় নিচ্ছে। তাদের আল্লাহর সাবধান বাণীর প্রতি কুছ পরোয়া নেই। যেখানে কুরআনের আয়াতে আয়াতে হাদীসের পরতে পরতে ইহুদি-খ্রিস্টানদের প্রতি আল্লাহ পাক সতর্ক বাণী উচ্চারণ করেছেন, ("যদি তারা আল্লাহর প্রতি ও রাসূলের প্রতি এবং তাঁর (রাসূলের) ওপর নাজেল হওয়া বিষয়ে ঈমান আনত, তবে কাফেরদেরকে বন্ধু ও অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করত না। কিন্তু তাদের মধ্যে অনেকেই হচ্ছে দুরাচার।"- আল-মায়েদা : ৮১), সেখানে শুধুমাত্র ক্ষমতার চেয়ারটুকু নিশ্চিত করার জন্য ইহুদি-খ্রিস্টান তথা পুত্তলিকদের বন্ধু বানিয়ে নিয়েছে তথাকথিত মুসলিম নেতৃবৃন্দ। ইহুদি-খ্রিস্টান সৈন্যদের অকথ্য নির্যাতনে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে যাওয়া শিশুর কান্না, অসহায় নারীর রোনাজারি তাদের কর্ণকুহরে পৌঁছে না। কেমন জানি কাফেরদের প্রতি তাদের অপ্রকাশ্য ঘোষণা হলো , ' আমাকে চেয়ারে বসিয়ে রাখ, আর তোমার যা ইচ্ছা তাই কর !' অথচ তারা যে জানেনা কিংবা জানলেও বোধহীন কারণ ক্ষমতার আসল মালিক আল্লাহ তা'আলা, যা তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে দান করেন। আল্লাহ পাক বলেন, "বল, ‘হে আল্লাহ! তুমি সমুদয় রাজ্যের মালিক, যাকে ইচ্ছে রাজ্য দান কর আর যার থেকে ইচ্ছে রাজ্য কেড়ে নাও এবং যাকে ইচ্ছে সম্মানিত কর আর যাকে ইচ্ছে অপদস্থ কর, তোমারই হাতে সব রকম কল্যাণ, নিশ্চয়ই তুমি সকল বস্তুর উপর ক্ষমতাবান’।" ( আল-ইমরান :২৬)
এত নিষ্ঠুরতা তথা বর্বরতার মাঝেও যে মুসলিম নেতৃবৃন্দ কিংবা রাষ্ট্র মুসলমানদের আশার আলো হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন তাঁদের ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য বা দমন করার জন্য কতিপয় নামধারী মুসলিম নেতৃত্ব বা দেশ আদা জল খেয়ে নেমে গেছে ! রাষ্ট্রীয় সকল তহবিল ঢেলে দিচ্ছে তথাকথিত শান্তির পরিকল্পনা নামক ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে। যেখানে উচিত ছিল অর্থ-বৈভব সবকিছু দিয়ে তাগুতি শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করা অথচ সেখানে রাষ্ট্রীয় অর্থে বুলেট কেনা হচ্ছে নিজের মুসলিম ভাইয়ের বুক ঝাঝরা করার জন্য। সেরকম কিছু নির্লজ্জ ষড়যন্ত্রের নমুনা নিম্নরূপ-
১. কাতারের উপর অবরোধ (বিবিস বাংলা, ৫ই জুন, ২০১৭ ইং)
২. গোপনে ইসরাইল সফর করলেন সৌদি যুবরাজ সালমান (পার্স টু ডে, ২১ই অক্টোবর, ২০১৭ ইং)
৩. ইসরাইল আমিরাত বাহরাইন চুক্তি সই (নয়াদিগন্ত, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০ইং)
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, মুসলিম জাতি আজ ক্ষমতালিপ্সু নেতৃত্বের খপ্পরে পড়ে প্রায় দেউলিয়াত্বের দ্বারপ্রান্তে ! যে জাতি এঁকেছিল বিশ্বব্যাপী সভ্যতার বিচিত্র সব রঙিন ছবি। যারা গড়েছিল শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ গবেষণার, আজ তাদেরকেই দেয়া হচ্ছে সভ্যতার ছবক (!) শুনানো হচ্ছে মাবতার সেই কল্পিত শ্লোক অথচ তাদেরই (কাফেরদের) হাতদ্বয় অবুঝ শিশুদের রক্তে রঞ্জিত ! কি আজিব তামাশা ! তাই জাতি বসে আছে সেই নব্য সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর প্রতীক্ষায়। যাকে নিয়ে ইতিহাসের পাতাগুলো আবেগময় কবিতায় ভরপুর। ইবনু সানান এক কবিতায় বলেন:
" শাসক তো নয় যেন আলসের ধাড়ি
সবগুলোর আচরণ শিশুদের মতো।
সালাহউদ্দীন আসামাত্রই দূর হলো আঁধার
সেরে গেলো নিমেষে রোগ-শোক যত।" (সালাহউদ্দীন আইয়ুবী, শাইখ আব্দুল্লাহ নাসিহ উলওয়ান রহ.- পৃ: ৫৫)
যিনি আবার ডাক দেবেন। দুনিয়া আর ক্ষমতার দ্বন্দ্বে অন্ধ মুসলিম শাসক বর্গকে একত্রিত করবেন। যার ডাকে ইহুদীদের তখ্তে আবার কাঁপুনি শুরু হবে, খ্রিস্টানদের খোলস পড়বে ধ্বসে। যার হুংকারে পুত্তলিকরা লেজ গুটিয়ে পালাবে। নির্যাতিতরা পাবে আশার দিশা। মুক্ত হবে জেরুজালেম।
যা নিয়ে কবি জুবাইর লিখেছেন:
"জেরুসালেম জয় হয়েছে দুইবারে দুই দিন,
একটি করেন উমার ফারুক, আরেকটি সালাহউদ্দীন।" (ঐ, পৃ : ৭১)
দূর হবে অনাহারীর কান্না, চতুর্দিকে আসবে শান্তির বন্যা। সত্যের চপেটাঘাতে জালিমের বিদায় ঘণ্টা বেজে উঠবে। বিকশিত হবে মানবিকতা, রোধ হবে হিংসা-বিদ্বেষ, কৃপণতা।
কেন এত আশার বাণী তার কারণ খোঁজে পাবেন মুসলিমদের প্রতি ৪৯২ হিজরি তথা ১০৯৯ খ্রিস্টাব্দে ক্রুসেডারদের আচরণ সংক্রান্ত ঐতিহাসিক প্রিন্স আলীর বিবরণ এবং ঐতিহাসিক পুলের বর্ণনার তুলনা থেকে-
১. প্রিন্স আলীর বর্ণনা,
" মুসলিমদেরকে রাস্তাঘাটে ও ঘরের ভেতর হত্যা করা হয়। কেউ কেউ গণহত্যা থেকে বাঁচার জন্য উঁচু দালানের ছাদ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। অন্যেরা কেল্লা, প্রাসাদ, এমনকি মাসজিদেও লুকিয়ে আশ্রয় নেয়। কিন্তু, খ্রিস্টানরা খুঁজে খুঁজে তাদেরকে বের করে আনে। পদাতিক ও অশ্বারোহীরা মুসলিমদের লাশের উপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে আশ্রয়সন্ধানী পলাতকদের খুঁজে বেড়ায়।" ( সালাহউদ্দীন আইয়ুবী, শাইখ আব্দুল্লাহ নাসিহ উলওয়ান রহ. পৃ-৭৭)
২.পুলের বর্ণনা, " বিকলাঙ্গ ও গরীবদেরকে মুক্তিপণ ছাড়াই সুলতান( সালাহউদ্দীন আইয়ুবী রহ.) বেরিয়ে যেতে দেন। ধর্মগুরু ও ধনীদেরকে সাধ্যমতো সম্পদ সাথে করে নেওয়ার অনুমতি দেন। তারা যতটুকু বহন করতে পারছিলো না, মুসলিমরা তা বহন করতে সাহায্য করে।" (ঐ, পৃ-৭৫)
উপর্যুক্ত আলোচনা তথা তুলনা থেকে এটা সহজেই অনুমেয় যে, প্রকৃত মুসলিম সিপাহসালাররা ( যিনি ব্যবহারিক জীবনে মুসলিম) ক্ষমতা অধিগ্রহণ করলে শুধু মুসলিম অধিবাসী নয় বরং ভিন বিশ্বাসীরাও নিরাপত্তা লাভ করে। এক্ষেত্রে ইসলামের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি হল-
" দীনের ব্যাপারে কোন জোর-জবরদস্তি নেই ৷ ভ্রান্ত মত ও পথ থেকে সঠিক মত ও পথকে ছাঁটাই করে আলাদা করে দেয়া হয়েছে ৷ এখন যে কেউ তাগুতকে অস্বীকার করে আল্লাহর ওপর ঈমান আনে , সে এমন একটি মজবুত অবলম্বন আঁকড়ে ধরে , যা কখনো ছিন্ন হয় না ৷ আর আল্লাহ (যাকে সে অবলম্বন হিসেবে আঁকড়ে ধরেছে ) সবকিছু শোনেন ও জানেন " (২:২৫৬)
শেষ বাক্য, যদি মুসলিম মাতৃকুল সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবীর রহ. নব্য উত্তরসূরী উপহার দিতে সক্ষম হয়, তাহলে এ উম্মাহ্ আবার আশার আলোয় উদ্ভাসিত হতে পারে।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন