আমরা চাইলেই পারি, প্রয়োজন শুধু একতার
ইসলামের সাথে এদেশের মানুষের সম্পর্ক সেটা নতুন কিছু না। সেটা প্রাণের, সেটা মনের। আমরা এটাও জানি যে, প্রায় সহস্র শতাব্দীর কাছাকাছি সময় মুসলমানরা ভারতীয় উপমহাদেশকে শাসন করেছিল দিল্লিকে কেন্দ্র করে অথচ সে দিল্লিতেই মুসলিমরা সংখ্যালঘু ! তার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অনেক ইতিহাসবিদ বলে থাকেন এটা অনেকটা মক্কা-মদিনার প্রসঙ্গের সাথে মিলে যায়। ইসলাম নবিজীর সা. হাত ধরে মক্কাতে আগমন করলেও সেখানকার অধিকাংশ বাসিন্দা তাকে (ইসলামকে) সাদরে গ্রহণ করতে পারে নাই। কিন্তু, মদিনার মানুষ ঠিকই বুঝতে পেরেছিল মানবতার সে দুর্লভ সমাধানের। তারা ইসলামকে স্থান দিয়েছিল অন্তরের অন্তস্থলে। বাংলার মুসলমানরাও ভারতীয় উপমহাদেশে শাসিত অঞ্চলে ছিল বটে শাসনের কেন্দ্রে ছিল না। কিন্তু, ঠিকই আত্মার কেন্দ্রে রেখেছিল ইসলামকে।
এদেশের মানুষ ইসলামকে ধারণ করার জন্য কি পরিমাণ ত্যাগ স্বীকার করেছে তার জীবন্ত চিত্র খোঁজে পাবেন 'বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস' ও 'আমাদের জাতি সত্ত্বার বিকাশ ধারা' গ্রন্থ দ্বয়ের প্রতিটি পরতে পরতে। দেখতে পাবেন, এদেশের মানুষ সবকিছু ছেড়েছে কিন্তু ছাড়েনি ইসলামকে। কিন্তু, শেষ সময়ে এসে ইংরেজরা দীর্ঘমেয়াদি শাসন-শোষণের পরিকল্পনার আওতায় 'ডিভাইড এন্ড রোল পলিসি' র মাধ্যমে মুসলমানদের মধ্যে বিভক্তির সূক্ষ্ম বীজ বুনে দেয় যা বুঝতে মুসলিম অঙ্গনের কতিপয় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব অক্ষম হওয়ার কারণে সেই সময়ে বপন করা বীজের কুফলের রেশ এখনও কাটেনি !
ইংরেজদের বিভক্তির কৌশলগত উপকরণ ছিল আলেম সমাজ। কারণ, এদেশে ইসলামের সূচনা লগ্ন থেকেই আলেম সমাজের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা ও আন্তরিকতা ছিল সুউচ্চ পর্যায়ের। তাই, ইংরেজরা বুঝতে পেরেছিল যে, শ্রদ্ধার মূল জায়গায় যদি বিভেদের বিষ বৃক্ষ রোপণ করা যায় তাহলে বাকী কাজ অবচেতনভাবে চলবে। ইংরেজরা চলে গেছে। কিন্তু, তাদের সেই বিষ বৃক্ষ তো রয়ে গেছে। তাই, নতুন শাসক গোষ্ঠীর আবির্ভাব হলেও তারা শাসন ক্ষমতা জিইয়ে রাখতে পুরনো সেই বিষ বৃক্ষের ফুল-ফল ব্যবহার করতে ভুলে না।
যার কারণে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হয়েও নাস্তিক তথা ইসলাম বিদ্বেষীরা এ দেশের কোটি কোটি মানুষের বিশ্বাসে আঘাত করেও পার পেয়ে যায় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায়। বিভেদের সেই বিষ বৃক্ষের ক্রিয়ায় আক্রান্ত মুসলিমরা মাঠে আসে ভিন্ন ভিন্ন ব্যানারে তবে অভিন্ন লক্ষ্যে। দিন শেষে ফলাফল শূণ্য ! কারণ, আমি বলবো না বরং আপনিই বলবেন 'বৃদ্ধ ও তার ছেলেদের কাঠি' র সেই গল্প থেকে।
তবে, আল্লাহ পাক কি বলেছেন এ বিষয়ে-
‘হে মুমিনগণ! তোমারা আল্লাহর রজ্জুকে (ইসলাম) আঁকড়ে ধর (ঐক্যবদ্ধ হও) এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। ’ -সূরা আল ইমরান: ১০৩'
আল্লাহ পাক আরও বলেন,
‘এই যে তোমাদের জাতি, এতো একই জাতি, আর আমি তোমাদের পালনকর্তা, অতএব তোমরা (ঐক্যবদ্ধভাবে) আমারই দাসত্ব কর। ’ -সূরা তওবা: ৯২
ঐক্য সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে কারিমের এক নির্দেশনা থাকার পরও বর্তমানে মুসলিম সমাজের ঐক্যের অভাবই বেশি পরিলক্ষিত হয়। মুসলিম জাতি এক প্রাণ, এক দেহ- এই চেতনাবোধ দিনে দিনে ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর আসছে। ইসলামে মুসলমানদের পারস্পরিক সর্ম্পক ভ্রাতৃত্বের। সুতরাং, এই ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক যখন বিরুদ্ধতায় পর্যবসিত হয়। তাহলে, ফলাফল শূণ্যের কোটায় থাকাটা-ই স্বাভাবিক। আপনাদের অস্তিত্ব থাকবে বটে প্রভাব থাকবে না। অর্থাৎ উদাহরণটি অনেকটা এরকমই মানুষ আছে তবে তা জীবিত নয় মৃত। তাই, ভিন্ন ভিন্ন নাম দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ব্যানারে না থেকে মুসলিমরা যদি শুধু এক নাম, এক ব্যানারে থাকত তাহলে তাঁদের অভেদ্য দুর্গে কেউ হানা দেয়ার সাহস করতো না।
এর বাস্তব উদাহরণ হল : প্রত্যেক অঙ্গনের আলেমরা যখন ইসলাম বিদ্বেষী ৭১ টিভির বিরুদ্ধে বয়কটের ডাক দিল সঙ্গে সঙ্গে ইউটিউব-ফেসবুকসহ সবক্ষেত্রে তাদের ফলোয়ার ধ্বসের ঝড় নেমেছে। অন্যান্য ইসলাম বিদ্বেষী মিডিয়া গুলোও চপেটাঘাত পেয়েছে, হয়েছে শঙ্কিত। যদি আমরা সত্যিই আমাদের একতার শক্তি দেখাতে পারতাম তাহলে ইসলাম বিরোধীদের মনে অবশ্যই বার্তা পৌঁছত যে এ বাংলার জমিনে মুসলিমদের বিশ্বাস-ঐতিহ্যে কেউ আঘাত করে পার পাবে না।
পরিশেষে একটি কথায়-ই বলবো, বাংলার বুকে ইংরেজরা বিভেদের যে বিষ বৃক্ষ রোপণ করেছিল তার মূলোৎপাটন করে যদি এ দেশের আলেম সমাজ ঐক্যের নব বৃক্ষ উপহার দিতে পারেন। তাহলে, ইসলাম বিরোধীদের কুপোকাত করা সময়ের ব্যাপার মাত্র।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন