'তাক‌ওয়ার ছায়ায় তারুণ্যের উন্মাদনা'


সৃষ্টির শুরু হতে পৃথিবীকে ভাঙা ও গড়ার ক্ষেত্রে তারুণ্য শক্তি-ই সবচেয়ে বেশি নেতৃত্ব দিয়েছে। কারণ, এ বয়সে বন্ধুর ও সমতল বলতে কিছু থাকে না। থাকে না কোন ক্লান্তির গ্লানি। শরীরজুড়ে শুধু ঢেউ তুলে দুরন্তপনার ছাপ।

তারুণ্য- শক্তিকে নিয়ে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য 'আঠারো বছর বয়স' কবিতায় যে চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন তার খণ্ডিতাংশ নিচে তুলে ধরা হল-


"আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ

র্স্পধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি,

আঠারো বছর বয়সেই অহরহ

বিরাট দুঃসাহসেরা দেয় যে উঁকি।


আঠারো বছর বয়সের নেই ভয়

পদাঘাতে চায় ভাঙতে পাথর বাধা,

এ বয়সে কেউ মাথা নোয়াবার নয়-

আঠারো বছর বয়স জানে না কাঁদা।"


এখানে আমরা মূলত 'আঠারো বছ‍র বয়স' বলতে তারুণ্য/যৌবনকে বুঝি। কোন সুনির্দিষ্ট বয়সের মাপকাঠিকে নয়। এখানে লেখক তারুণ্যের যে রূপ তুলে ধরেছেন তা থেকে অতিসহজে‌ই প্রতিয়মান হয় যে, তারুণ্যের কি অদম্য শক্তি। যা উত্তাল তরঙ্গমালাকে‌ও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়।


নিম্নোক্ত হাদীস থেকেও এ বয়সের গুরুত্ব খোঁজে পাই-

হযরত ইবনে মাসউদ রা. রাসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, (হাশরের দিন) মানুষের পা একবিন্দু নড়তে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তার নিকট এই পাঁচটি বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা না হবে। এক. নিজের জীবনকাল সে কোন কাজে অতিবাহিত করেছে? দুই. যৌবনেরে শক্তি সামর্থ কোথায় ব্যয় করেছে? তিন. ধন সম্পদ কোথা হতে উপার্জন করেছে? চার. অর্জিত ধন সম্পদ কোথায় ব্যয় করেছে? পাঁচ. এবং (দীনের) যতটুকু ইলম অর্জন করেছে সে অনুযায়ী কতটুকু আমল করেছে? (জামে তিরমিযী : ৪/২৪১৬)।


উক্ত হাদীসটি যদি আমরা সূক্ষ্মভাবে লক্ষ্য করি তাহলে দেখতে পাব আল্লাহ পাক এখানে পুরো জীবনের জবাবদিহিতার পর আলাদা করে যৌবন‌কালকে জবাবদিহিতা‌র লক্ষ্য‌বিন্দু বানিয়েছেন অথচ যৌবনকাল পুরো হায়াতের‌ই একটি অংশবিশেষ। এ থেকেই বুঝা যায় যৌবনের গুরুত্ব কতটুকু। এ তো গেল একদিকের কথা। তবে, এখানে একটি জটিল হিসাব থেকে গেছে ! সেটা কি ? সেটা জানার জন্য আমাদের নিশ্চয়‌ই ছুরির ছোট্ট সেই গল্পটি মনে করতে হবে-

একটি ছুরি দিয়ে ডাক্তার মানুষের বিভিন্ন অঙ্গ-পতঙ্গের কাটাছেঁড়া করে। আবার একই ছুরি দিয়ে একজন ডাকাত‌ও মানুষের অঙ্গ-পতঙ্গের কাটাছেঁড়া করে। কিন্তু, একজনের কাটাছেঁড়া‌য় মানুষ সুস্থ হয় কিংবা বাঁচে; অপরজনের কাটাছেঁড়া‌য় মানুষ মরে! এ থেকে কি বুঝতে পারলেন? উপলব্ধি করলেন যে, এক‌ই জিনিস কেবল ব্যবহারের ভিন্নতা‌র জন্য ফলাফল‌ও ভিন্ন। 


তাই, জীবনের অতিগুরুত্বপূর্ণ অংশ হলে‌ও কেবল ব্যবহারের ধরনের‌ উপরে‌ই নির্ভর করবে যৌবনের ফলাফল। তার কিছু জলন্ত নমুনা নিম্নরূপ-


ইতিবাচক-

প্রথম, 

১৯৩৫ সালে, নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্র সম্মেলনে দশম শ্রেণির চৌদ্দ বছরের যে বালকটি তার বিশ/পঁচিশ মিনিটের ভাষণে সকল জাদরেল বক্তাকে মাত করে দিয়েছিলেন সাঁইত্রিশ বছর পর তিনিই হয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী।


 (মোরা বড় হতে চাই, ড. আহসান হাবীব ইমরোজ পৃ : ৪)


দ্বিতীয়,

১৯৪৮ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে যে ছেলেটি তৎকালীন পাকিস্তানের প্রথম কিশোর পত্রিকা ‘মুকুল’এর পাঠক নয় সম্পাদক হয়েছিলেন, তিনি হন পরবর্তীতে ইউনেস্কোর সম্মানজনক আর্ন্তজাতিক কলিঙ্গ পুরস্কার পাওয়া এশিয়দের দু’জনের একজন ডঃ আব্দুল্লাহ আল মুতি।


 (মোরা বড় হতে চাই, ড. আহসান হাবীব ইমরোজ পৃ-৫)


নেতিবাচক-

১.খাদিজার উপর হামলাকারী বদরুলের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড (৮-ই মার্চ ২০১৭, বিবিসি)


২.রিফাত হত্যার নেপথ্যে ‘বন্ড ০০৭’! (২৯-ই জুন, ২০১৯ ইং, পিরোজপুর সংবাদ)


কি দেখলাম? প্রত্যক্ষ করলাম, যৌবনের দুটি চেহারা অর্থাৎ স্তর এক হলেও দৃশ্য ভিন্ন। এক‌ই বয়সে কেউ সফলতার সাক্ষর রাখতে গিয়ে খ্যাতির মুকুট পরেছেন আবার কেউবা কুখ্যাতির বলে পত্রিকার পাতার শিরোনাম দখল করে আছে ! তবে, 'যৌবন' নামক আল্লাহ‌র নিয়ামত‌টি ঘুণে ধরা এই পৃথিবীতে গড়ার কাজে বারবার আলোড়ন তুলেছিল একটি অদৃশ্য বোধশক্তির ছায়া পেয়ে। এটি হল সেই আবিহায়াত যা মানুষকে চলার পথে চূড়ান্ত বিশুদ্ধতা‌ অর্জনে সাহায্য করে। এনে দেয় দয়াময়ের সান্নিধ্য। এটি হল তাক‌ওয়া বা পরহেজগারিতা। যার পরিচয় নিম্নরূপ-


তাক‌ওয়ার পরিচয়-


তাকওয়া শব্দের অর্থ হচ্ছে খোদাভীতি তথা গোনাহ থেকে আত্মরক্ষা করা। হজরত ওমর (রা.) একবার হজরত কাব আল আহবারকে রা. তাকওয়ার সংজ্ঞা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, আপনি কি কখনও কণ্টকাকীর্ণ পথে চলেছেন, হজরত ওমর (রা.) বলেন, হ্যাঁ। তিনি বলেন, তখন আপনি কি রূপ সতর্কতা অবলম্বন করেন। হজরত ওমর (রা.) বলেন, আমি পরিধেয় বস্ত্র সংযত করে চলি। হজরত কাব (রা.) বলেন, এটাই হচ্ছে তাকওয়া। এ কথা থেকে বোঝা যায়, পৃথিবীতে পাপ-পঙ্কিলতার কাঁটা ছড়ানো-ছিটানো রয়েছে। তা হতে সতর্কভাবে আত্মরক্ষা করে চলার নাম হচ্ছে তাকওয়া।


এ নিয়ে মহান আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন,

 'হে মোমিনরা, যদি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করো, তবে আল্লাহ তোমাদের ন্যায়-অন্যায়, কল্যাণ-অকল্যাণ পার্থক্য করার শক্তি দেবেন, তোমাদের পাপ মোচন করবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করবেন। আর আল্লাহ অতিশয় মঙ্গলময়।' (সূরা আনফাল : ২৯)


আরও উল্লেখ আছে, 'তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তি বেশি মর্যাদাবান যে তোমাদের মধ্যে বেশি মুত্তাকি।' (সূরা হুজরাত : ১৩)


আল্লাহ পাক আরও বলেন, 'যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহ তার জন্য একটা পথ করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে দান করেন যা সে কল্পনাও করে না।' (সূরা তালাফ : ২-৩) 


আল্লাহ পাক বলেন, হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় কর এবং তোমরা মুসলিম তথা আত্মসমর্পণকারি না হয়ে কোনো অবস্থায় মরো না। (সূরা আল ইমরান- ৩/১০২)


নবিজীর বাণী-

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই যে তার প্রতি জুলুম করে না, তাকে অপমানিত করে না তাকে অসহায় বন্ধুহীন করে না। তাকওয়া এখানে এই বলে তিনি নিজ বক্ষের দিকে তিনবার ইঙ্গিত করেন। (মুসলিম শরিফ)।


হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) কে প্রশ্ন করা হলো, ইয়া রাসূলুল্লাহ মানুষের মধ্যে অধিক সম্মানিত কে? তিনি বললেন, তাদের মধ্যে যে অধিক মুত্তাকি বা পরহেজগার। (বুখারি ও মুসলিম)


পরিশেষে বলতে চাই, তারুণ্যশক্তি যদি তার উন্মাদনা বন্ধ করে একটি সভ্য পৃথিবী বিনির্মাণে নিয়ামক হিসেবে আবির্ভূত হতে চায়। যদি চায় সর্বত্র আশার দ্বার উন্মুক্ত করে হতাশাকে মিটিয়ে দিতে। তাহলে আমি বলবো তাক‌ওয়া-ই সে চাবিকাঠি যা পথিকের অন্ধত্বের সকল রুদ্ধদ্বার খুলে দিবে। উপহার দেবে তেজস্বীতার ভিন্ন এক চেহারা।

মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

"Quran is the only solution to humanity"

■ একটি জান্নাতী পুষ্প : মুস‌আব বিন উমাইর রা.

ফরাসী প্রেসিডেন্টের কেন এত ইসলাম বিদ্বেষ?