'ইতিহাসের শিক্ষা'
স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ। এটাকি কোন মামুলি ঘোষকের ঘোষণা ? না, বরংচ এটি চিরন্তন ও বৈজ্ঞানিক সত্য কথা। তবে, এখানে একটি 'কিন্তু' রয়েছে ! সেই 'কিন্তু'-কে নিয়েই বাকি লেখাটুকু। আশা করি, শেষ বাক্য পর্যন্ত সাথে থাকবেন।
মুসলিম হিসেবে ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে আমরা জানি যে, জান্নাতে হযরত আদম ও হাওয়া (আঃ) শয়তানের কি ধোঁকাবাজির শিকার হয়েছিলেন! পেয়েছিলেন কতশত মানসিক যন্ত্রণা! তা জানতে কুরআনের পাতায় ক্ষণিকের জন্য চোখ বুলিয়ে আসি-
আদেশ করলেন-‘হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করতে থাকো এবং যেখান হতে ইচ্ছা খাও। তবে তোমরা এই বৃক্ষের নিকটে যাবে না। যদি যাও তবে জুলুমকারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’ (সূরা আ’রাফ-আয়াত : ১৯)
"এরপর শয়তান, আদম ও তার স্ত্রীকে পথভ্রষ্ট করল এবং তারা যে বেহেশতে ছিল সেখান থেকে তাদেরকে বহিস্কার করল। সে সময় তাদেরকে বললাম তোমরা নীচে নেমে যাও একে অন্যের শত্রু হিসাবে। পৃথিবীতে কিছুকালের জন্য তোমাদের বসবাস ও জীবিকা রইল।"(২:৩৬)
"অতঃপর হযরত আদম (আ.) স্বীয় পালনকর্তার কাছ থেকে কয়েকটি কথা শিখে নিলেন, (এবং তাওবা করলেন) অতঃপর আল্লাহ পাক তাঁর প্রতি (করুণাভরে) লক্ষ্য করলেন। নিশ্চয়ই তিনি মহা-ক্ষমাশীল ও অসীম দয়ালু।"(২:৩৭)
কি দেখতে পেলেন? পর্যবেক্ষণ করলেন, আমাদের সূচনা থেকেই আমাদের শত্রু আদি পিতাকে প্রতারণার গোলক ধাঁধায় ফেলে দিয়েছিল। পরক্ষণেই, হারাতে হলো চির প্রশান্তির আশ্রয়স্থল জান্নাতকে। তিনি আমাদের জন্য নিদর্শন হিসেবে ছিলেন। কিন্তু, আমরা কি সে নিদর্শন থেকে শিক্ষা নিয়েছি বা নিচ্ছি ? কেন নি নাই ? সে জবাব পরে আসতেছে।
যখন পুরো পৃথিবীজুড়ে চলছিল হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণ, তখন হতাশার আশা, দুঃখী-দুঃখিনীদের বন্ধু হিসেবে যে মানুষটি আবির্ভূত হয়েছিলেন তিনি ছিলেন মুহাম্মদ সা.। যা সচেতন মুসলিম মাত্র অদ্বিতীয় বাক্য ব্যয়ে স্বীকার করে নেবেন। কিন্তু, তাঁর সঙ্গে সহস্র নবীর আ. হত্যাকারী ও মুসা (আ)-এর সাথে অশালীন আচরণকারীদের উত্তরসূরীরা কি ঘটিয়েছিল তার একটি ক্ষুদ্র নমুনা নিচে তুলে ধরা হল-
" হিজরি চতুর্থ সালের কথা। আমর বিন উমাইয়া যামরী আমের গোত্রের দুই..............বনু নাযীর গোত্রের লোকদের কাছে গেলেন। সেখানকার লোকেরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একটি দেয়ালের ছায়ার নীচে বসালো। তারপর গোপনে সলাপরামর্শ করতে লাগলো যে, একজন উপরে গিয়ে তাঁর মাথার ওপর বিরাটকায় পাথর ফেলে দিয়ে হত্যা করবে।......রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের দুরভিসন্ধি টের পেয়ে আগে ভাগেই উঠে চলে এলেন।" (মানবতার বন্ধু মুহাম্মদ সা. পৃ-২৮৩)
"খয়বর যুদ্ধের সময় জনৈকা ইহুদি মহিলা যয়নব বিনতুল হারস (ছালাম বিন মুশকিমের স্ত্রী) একটি বকরীর গোশত ভুনে রান্না করে এবং তাতে বিষ মিশিয়ে দেয়। এর পরে সে জিজ্ঞেস করে, বকরীর কোন অংশ রসূল সা. বেশি ভালোবাসেন। যখন জানতে পারলো যে, সামনের পায়ের গোশত বেশি প্রিয়, তখন তাতে আরো বেশি করে তীব্র ধরনের বিষ মেশালো।" ( মানবতার বন্ধু মুহাম্মদ সা. পৃ : ২৮৩-২৮৪)
তাদের সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাকের সাবধান বাণী-
"হে রাসুল! তাদের জন্য দুঃখ করবেন না, যারা দৌড়ে গিয়ে কুফরে পতিত হয়; যারা মুখে বলে, আমরা ইমান এনেছি, অথচ তাদের অন্তর ইমান আনেনি। আর যারা ইহুদি তারা মিথ্যা বলার জন্য গুপ্তচরবৃত্তি করে। (তাদের মধ্যে) যারা আপনার কাছে আসেনি তারা অন্য দলের গুপ্তচর। তারা (আল্লাহর) কালামকে স্বস্থান থেকে পরিবর্তন (বিকৃত) করে। তারা বলে, যদি তোমরা এ নির্দেশ পাও, তবে তা গ্রহণ কোরো আর যদি এ নির্দেশ না পাও, তবে বিরত থেকো। আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করতে চান, তার জন্য আল্লাহর কাছে আপনি কিছুই করতে পারবেন না। তারা এমনই যে আল্লাহ তাদের অন্তরকে পবিত্র করতে চান না। তাদের জন্য দুনিয়ায়ও রয়েছে লাঞ্ছনা আর আখিরাতে রয়েছে বিরাট শাস্তি। (সুরা আল-মায়েদা : ৪১)
তাদের এতসব কুকীর্তি জানার পরও কেন তাদের সাথে এখনও আমাদের দহরম-মহরম সম্পর্ক? কেন আপন দ্বীনি ভাইদের বাদ দিয়ে তাদের সাথে 'সম্পর্ককে' নিজেদের নিরাপত্তার রক্ষাকবজ মনে করতেছি? কেন এই বাতুলতা ? তার উত্তর অতিনিকটেই।
আমাদের এই ভারতীয় উপমহাদেশে বাণিজ্য করতে আসার সুযোগে যারা প্রায় দুশো বছর শাসন-শোষণ উপহার দিয়েছিল সেতো বেশি দিন আগের কথা নয়। কারা জমিদারিত্ব পাওয়ার জন্য বাংলার স্বাধীনতাকে বিকিয়ে দিতে ব্রিটিশদের দূতিয়ালি করেছিল? কি সেই লেখকের নাম যে কিনা ১৮৬০-এর দশকে 'বঙ্গে মাতরম' নামক সংগীত রচনা করে জাতিগত সংঘাত তৈরি করেছিল ? আবার পরে আধুনিক গদ্যের জনক ধারণ করল! কি সেই সংগীতের নাম যা আপন জমিদারিত্ব ঠিকিয়ে রাখতে রচিত হয়েছিল? আবার তা-ই একটি স্বাধীন দেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে অথচ যে (সংগীতের লেখক) কিনা সে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ (ঢাবি) হওয়ার বিরোধিতা করেছিল! কেনইবা একই দেশের একজন কবি ইংরেজদের কাছ থেকে চার দেয়ালের আবদ্ধ জীবন উপহার পায় ? আবার কেনইবা আরেকজন পায় 'নাইট' উপাধি! কেনইবা ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম লীগ গঠিত হয়েছিল? কেনইবা ১৯৪৭ সালের আগে ভারতীয় উপমহাদেশে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের জন্য ৬ বছর 'পাকিস্তান আন্দোলন' সংঘটিত হয়েছিল?
সেই প্রতিক্ষীত তবে সংক্ষিপ্ত জবাব-
এতসব দ্বিমুখী পরিস্থিতি তৈরি এবং একই গর্তে বারবার পড়ার কারণ একটাই তাহল মানুষ তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে না। যে গুণের ব্যবহারের কারণে মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব তার সেই বিবেক বা বোধশক্তির যথাযথ ব্যবহার সে করে না!
কিন্তু, কেন?
কারণ, জর্জ বার্নার্ড শ বলেছেন," ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এই যে, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা গ্রহণ করে না !''

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন